AIBookCraft

Chapter 1

শান্ত পুকুরপাড়ের মায়া

শান্ত গ্রামের মায়ার সুখের সংসার। প্রতিদিন সকালে পুকুরপাড়ে মাছদের খাবার দেওয়া তার অভ্যাসে পরিণত হয়। মাছগুলো যেন তাকে চিনত। এই শান্ত জীবন হঠাৎ এক ঝড়ো রাতে বদলে যায়।

7 min read

বাংলার এক শান্ত, সবুজে ঘেরা গ্রাম। নাম তার নিরালা। চারদিকে দিগন্ত বিস্তৃত ধানের ক্ষেত, মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা বাঁশঝাড়, আর সবুজ কলার পাতায় ভরা গাছপালা। গ্রামের ঠিক মাঝখানে একটি বড়, গভীর পুকুর—যেন এক আয়নার মতো, আকাশের নীল আর মেঘেদের আনাগোনা প্রতিবিম্বিত করে। সেই পুকুরের পাশেই, ছোট্ট একটি টিনের ঘরে, মায়াদের বাস। মায়া, তার স্বামী আর বৃদ্ধা শাশুড়িকে নিয়ে তার ছোট্ট সুখের সংসার। মায়ার রূপে যেমন ছিল মুগ্ধ করার মতো, তেমনি ছিল তার মনটাও। দয়ালু, শান্ত আর দায়িত্বশীল।

প্রতিদিন ভোরের আলো ফোটার আগেই মায়ার ঘুম ভেঙে যেত। পাখিদের কিচিরমিচির শব্দে তার ঘুম ভাঙত, আর তারপর শুরু হতো তার দিনের কাজ। প্রথমে উঠান ঝাড়ু দেওয়া, তারপর হাঁস-মুরগিগুলোকে খাবার দেওয়া। এরপর হেঁশেলে ঢুকে রান্না শুরু করত। সকালের নাস্তা সেরে, হাতে এক বাটি গরম ভাত নিয়ে সে বেরিয়ে পড়ত পুকুর পাড়ের দিকে। তার অপেক্ষায় থাকত পুকুরের মাছেরা। মায়া পুকুরে ভাত ছিটিয়ে দিতেই অসংখ্য মাছ পানির উপর ভেসে উঠত, যেন তারা মায়াকে অনেক ভালোবাসে। মায়ার দিন শুরু হতো এই দৃশ্য দেখে, তার মন ভরে যেত এক অনাবিল শান্তিতে। মাছগুলো যেন তাকে চিনত, তাদের চোখেমুখে ছিল এক অদ্ভুত মায়া।

একদিন, সবকিছু বদলে গেল। দুপুর গড়িয়ে বিকেল নামতেই আকাশ কালো মেঘে ছেয়ে গেল। মুহূর্তেই শুরু হলো প্রবল ঝড়-বৃষ্টি। মেঘের গুরুগুরু শব্দ আর বজ্রপাতের তীব্র আলোয় চারপাশ কেঁপে উঠছিল। বাতাসে দুলছিল বাঁশঝাড়, কাঁপছিল গাছপালা। সারাদিনের সেই অঝোর বৃষ্টির কারণে মায়া আর মাছদের খাবার দিতে যেতে পারল না। সন্ধ্যা নেমে এল, রাতের খাবার শেষ হলো। হঠাৎ মায়ার মনে পড়ল – আজ তো মাছগুলো না খেয়েই আছে!

"ওমা, আজ তো মাছগুলোকেই খাবার দেওয়া হলো না," মায়া বলল।

বৃদ্ধা শাশুড়ি, যিনি তার নিজের ছেলের চেয়েও মায়াকে বেশি ভালোবাসতেন, তিনি মায়ার দিকে তাকিয়ে বললেন, "মা, আজ যাস না। রাতটা ভালো লাগছে না। ঝড়-বৃষ্টি থামুক, কাল সকালে যাবি।"

মায়া মুচকি হেসে তার শাশুড়ির হাত ধরল। "একটু গিয়েই চলে আসব মা। ওরা তো সারাদিন না খেয়ে আছে। আমারও ভালো লাগবে না।"

তার স্বামীও ঘরে ছিল। মায়ার কথা শুনে সেও একটু চিন্তিত হলো। "সত্যিই তো, এত রাতে একা একা যাওয়া ঠিক হবে না। কাল সকালে গেলেই হবে।"

কিন্তু মায়া নাছোড়বান্দা। মাছগুলোর জন্য তার মন কেমন করছিল। "তোমরা চিন্তা কোরো না। আমি একটু পরেই চলে আসব।"

এক বাটি ভাত আর একটি কালো ছাতা হাতে নিয়ে মায়া বেরিয়ে পড়ল। প্রবল বৃষ্টি আর ঝড়ের মধ্যে কাদামাখা পথ ধরে সে একা পুকুরের দিকে হাঁটতে লাগল। বিদ্যুতের ঝলকে মাঝে মাঝে চারপাশ আলোকিত হয়ে আবার অন্ধকারে ডুবে যাচ্ছিল। ঝোড়ো বাতাস তার ওড়না উড়িয়ে নিচ্ছিল, বৃষ্টির ছাঁট তার মুখে এসে লাগছিল। কিন্তু তার মনে শুধু মাছগুলোর কথা।

পুকুরের ধারে পৌঁছে মায়া ভাত ছিটিয়ে দিল। কিন্তু আজ অদ্ভুত কিছু ঘটল। একটিও মাছ পানির উপরে উঠল না। পুরো পুকুর যেন মৃত্যুর মতো নিস্তব্ধ। শান্ত, সবুজে ঘেরা গ্রামের এই পুকুরটিই ছিল তার জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ, যেখানে সে পেত শান্তি। কিন্তু আজ সেই পুকুর যেন এক অন্য রূপ ধারণ করেছে। অবাক হয়ে মায়া পানির দিকে তাকিয়ে রইল। ঠিক তখনই, গভীর কালো জলের নিচে ধীরে ধীরে জ্বলে উঠল দুটি রক্তলাল চোখ। সেই চোখ দুটি স্থির হয়ে তাকিয়ে রইল তার দিকে। এক অপার্থিব, হিমশীতল অনুভূতি মায়াকে গ্রাস করল। এরপর ভেসে এল এক ভয়ংকর ফিসফিসে কণ্ঠ, "আমি... অপেক্ষা করছিলাম..."

ভয়ে মায়ার হাত থেকে ছাতা পড়ে গেল। সে আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়িয়ে থাকার সাহস পেল না। প্রাণপণে দৌড়ে বাড়ির দিকে ছুটল। বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে, কাদামাটি মেখে সে ছুটে চলল। পেছনে তাকিয়ে দেখার সাহসটুকুও তার হলো না।

বাড়িতে ফিরে হাঁপাতে হাঁপাতে মাটিতে বসে পড়ল। তার স্বামী আর শাশুড়ি ছুটে এলেন। "কী হয়েছে মা? এত ভয় পেলে কেন?" শাশুড়ি জিজ্ঞেস করলেন।

মায়া শ্বাস নিতে পারছিল না। সে কিছু বলতে পারছিল না, শুধু কাঁপছিল। সে চেয়েছিল না তার পরিবারের কেউ ভয় পাক। তাই সে কিছু বলল না। শুধু বলল, "কিছু না। শুধু ঝড় দেখে ভয় পেয়েছি।"

সেদিন রাতে মায়ার ঘুম ভাঙল এক অসহ্য পচা গন্ধে। গন্ধটা যেন হাওয়ায় ভেসে বেড়াচ্ছে, কিন্তু কোথা থেকে আসছে তা বোঝা যাচ্ছে না। ধীরে ধীরে সে জানালার দিকে তাকাল। আর যা দেখল, তাতে তার রক্ত হিম হয়ে গেল। জানালার বাইরে, বৃষ্টির মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে এক ভয়ংকর পিশাচ। তার লম্বা ভেজা কালো চুল মুখের অর্ধেক ঢেকে রেখেছে। ফ্যাকাশে সাদা শরীর, জ্বলজ্বলে রক্তলাল চোখ, আর ঠোঁটে এক বিভৎস হাসি। পিশাচটি ধীরে ধীরে জানালার কাঁচের উপর হাত রাখল। তারপর ফিসফিস করে বলল, "আমি তোমাকে নিয়ে যাব..."

মায়ার চিৎকারে পুরো বাড়ি কেঁপে উঠল। তার স্বামী আর শাশুড়ি তেলের প্রদীপ হাতে ছুটে এলেন। কিন্তু বাইরে তাকিয়ে দেখলেন—কেউ নেই। শুধু ঝিরিঝিরি বৃষ্টি পড়ছে। মায়া তখনও ভয়ে কাঁপছে। তার স্বামী তাকে জড়িয়ে ধরল। "কী হয়েছে মায়া? কাকে দেখেছ?"

কিন্তু মায়া আগের মতোই চুপ। সে কিছু বলতে পারছে না।

পরদিন থেকেই মায়ার শরীর খারাপ হতে শুরু করল। গ্রামের ডাক্তার এলেন, ওষুধ দিলেন, কিন্তু কোনো লাভ হলো না। দিনের পর দিন সে আরও দুর্বল হয়ে পড়তে লাগল। কখনো অকারণে হাসত, কখনো হঠাৎ কেঁদে উঠত, কখনো শূন্যে তাকিয়ে কারও সঙ্গে কথা বলত। রাতের নিস্তব্ধতা যখন গভীর হতো, তখন তার আচরণ আরও ভয়ঙ্কর হয়ে উঠত। তার চোখ দুটো যেন আরও বেশি জ্বলজ্বল করত।

এক গভীর রাতে মায়ার স্বামীর ঘুম ভেঙে গেল। পাশে হাত বাড়াল, কিন্তু মায়াকে পেল না। বুকটা ধড়াস করে উঠল। সে লণ্ঠন হাতে পুরো বাড়ি খুঁজতে লাগল। মায়া কোথায়? রান্নাঘরে গিয়ে যা দেখল, তাতে তার বুক হিম হয়ে গেল। মায়া মেঝেতে বসে আছে, আর কাঁচা মাছ ছিঁড়ে ছিঁড়ে খাচ্ছে। তার মুখ রক্তে ভরা।

স্বামীকে দেখে মায়া ধীরে ধীরে মুখ তুলল। তার চোখ দুটো জ্বলছে লাল আগুনের মতো। অমানুষিক কণ্ঠে বলল, "আমি... মায়া নই..."

স্বামী ভয়ে চিৎকার করে উঠল। শাশুড়িও ছুটে এলেন। এ দৃশ্য দেখে তারা হতবাক। এই কি তাদের মায়া? এই কি তাদের আদরের বউ?

খবর ছড়িয়ে পড়ল গ্রামে। সবাই ভয় পেয়ে গেল। গ্রামের এক শক্তিশালী তান্ত্রিকের কথা মনে পড়ল তাদের। তান্ত্রিককে ডেকে আনা হলো। গেরুয়া বসন পরা বৃদ্ধ তান্ত্রিক ঘরের ভেতর প্রবেশ করলেন। তিনি পবিত্র মন্ত্র পাঠ শুরু করলেন। ঘরের মোমবাতিগুলো কাঁপতে লাগল। হঠাৎ ঘরের ভেতর এক প্রচণ্ড ঝড় উঠল। ঘরের আসবাবপত্র কাঁপতে শুরু করল। মায়া বিকট চিৎকার করতে লাগল। তার শরীরটা যেন এক অশুভ শক্তি দ্বারা চালিত হচ্ছে।

অনেকক্ষণ ধরে চলল এই টানাপোড়েন। অবশেষে, তান্ত্রিকের মন্ত্রের প্রভাবে সেই অশুভ শক্তি যেন কিছুটা দুর্বল হলো। মায়ার মুখ থেকে এক অন্য কণ্ঠ ভেসে এল। পিশাচটি নিজের পরিচয় দিল। তার নাম—ত্রয়ী।

এরপর শুরু হলো এক ভয়ংকর কাহিনি। ত্রয়ী একসময় এই গ্রামেরই একজন শান্ত-স্বভাবের নারী ছিল। কিন্তু তার স্বামী ছিল নিষ্ঠুর। প্রতিদিন নির্যাতন করত তাকে। এক ঝড়ের রাতে, ত্রয়ীর স্বামী তাকে নির্মমভাবে হত্যা করে। তারপর তার মৃতদেহ গোপনে এই পুকুরে ফেলে দেয়। কেউ কখনো এই সত্য জানতে পারেনি। অন্যায়ের বিচার না হওয়ায় ত্রয়ী মৃত্যুর পর এক ভয়ংকর পিশাচে পরিণত হয়। বছরের পর বছর সেই পুকুরে ঘুরে বেড়াতে থাকে। আর ঝড়ের রাতে, যখন মায়া মাছদের খাবার দিতে এসেছিল, তখন সে মায়ার শরীরে ভর করে।

তান্ত্রিক গ্রামের লোকদের নির্দেশ দিলেন ত্রয়ীর স্বামীকে ধরে আনতে। গ্রামবাসীরা তাকে ধরে নিয়ে এলো। ত্রয়ী, মায়ার শরীরের ভেতর থেকে, ক্রোধে তার দিকে ঝাঁপিয়ে পড়তে চাইল। কিন্তু তান্ত্রিক শক্তিশালী মন্ত্রে তাকে থামিয়ে দিলেন। তিনি ত্রয়ীর দিকে তাকিয়ে বললেন, "প্রতিশোধ কখনো নিরপরাধ মানুষের মাধ্যমে নেওয়া যায় না। সত্যের বিচারই অশুভ শক্তির শেষ।"

গ্রামবাসীরা পুলিশে খবর দিল। দীর্ঘ জিজ্ঞাসাবাদের পর অবশেষে ত্রয়ীর স্বামী নিজের অপরাধ স্বীকার করল। তাকে হাতকড়া পরিয়ে নিয়ে যাওয়া হলো। আইনের কঠোর শাস্তি হলো তার।

অবশেষে, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হলো। সেই মুহূর্তে, মায়ার শরীর থেকে ত্রয়ীর ভয়ংকর রূপ বদলে যেতে শুরু করল। তার রক্তলাল চোখ নিভে গেল। মুখের বিভৎস হাসি মিলিয়ে এক শান্তির ছাপ ফুটে উঠল। সে মায়ার দিকে তাকিয়ে ধীরে বলল, "ধন্যবাদ... আমাকে মুক্তি দেওয়ার জন্য..."

এরপর তার কালো ছায়াময় দেহ ধীরে ধীরে এক উজ্জ্বল সাদা আলোয় পরিণত হলো। সেই আলো আকাশের দিকে উঠে রাতের অন্ধকারে মিলিয়ে গেল। মায়া অজ্ঞান হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল।

পরদিন সকালে যখন তার জ্ঞান ফিরল, সে সম্পূর্ণ সুস্থ। গত কয়েক দিনের কোনো ঘটনাই তার মনে নেই। যেন এক দুঃস্বপ্ন দেখে জেগে উঠেছে। আবার ফিরে এল গ্রামের শান্ত জীবন। সকালের রোদ ঝলমল করছে। পাখিরা গান গাইছে। পুকুরের জল শান্ত। মায়া আবার হাসিমুখে পুকুর পাড়ে মাছদের খাবার দিচ্ছে। পাশে দাঁড়িয়ে আছে তার স্বামী আর বৃদ্ধা শাশুড়ি। তাদের মুখে লেগে আছে স্বস্তির হাসি।

ক্যামেরা ধীরে ধীরে আকাশে উঠে পুরো সবুজ গ্রামটিকে দেখায়। শান্ত পুকুর, দুলতে থাকা ধানের ক্ষেত, আর দূরে মিলিয়ে যেতে থাকে এক রহস্যময় সুর। সবকিছু শান্ত, সবকিছু স্বাভাবিক। কিন্তু এই শান্ত পরিবেশের গভীরে লুকিয়ে আছে এক ভয়ংকর রাতের স্মৃতি, যা চিরকাল মায়ার মনে এক অমলিন ছাপ রেখে যাবে।

✦ ✦ ✦
Play from here

Privacy choices

Optional analytics help us improve AIBookCraft. They stay off until you allow them. We still count anonymous page views, without cookies or an ID. Writing, sign-in, and checkout work either way.

Change this choice any time. Read our Privacy Policy.