Chapter 2

রহস্যময় গুহার সন্ধান

উপত্যকার গভীরে প্রবেশ করে তারা একটি প্রাচীন ও রহস্যময় গুহার সন্ধান পায়। গুহার প্রবেশদ্বার যেন এক অজানা জগতের হাতছানি।

6 min read

উপত্যকার ঘন জঙ্গলের ভেতর দিয়ে রাহুল আর মিতা এগিয়ে চলল। চারপাশটা থমথমে, কেমন যেন একটা নিস্তব্ধতা। সূর্যের আলো গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে চুঁইয়ে এসে মাটিতে আলো-ছায়ার এক অদ্ভুত নকশা তৈরি করেছে। হাওয়ায় ভেসে আসছে অচেনা ফুলের মিষ্টি গন্ধ, কিন্তু তার সাথে মিশে আছে এক ধরনের ভয়ের অনুভূতি। রাহুল, যার চোখে-মুখে সবসময় নতুন কিছু জানার আগ্রহ, সে এই পরিবেশের প্রতিটি রেণু অনুভব করছে। মিতা, তার চেয়ে অনেক বেশি সতর্ক, প্রতি মুহূর্তে চারপাশটা জরিপ করছে, কোনো বিপদ আসছে কিনা সেদিকে তার তীক্ষ্ণ নজর।

"রাহুল, আমার মনে হচ্ছে আমরা আরও গভীরে চলে এসেছি," মিতা বলল, তার গলার স্বরে কিছুটা উদ্বেগ।

রাহুল চারপাশটা একবার দেখে নিয়ে বলল, "হ্যাঁ, তাই তো মনে হচ্ছে। এই উপত্যকাটা সত্যিই অন্যরকম। মনে হচ্ছে যেন সময়ের স্রোত এখানে এসে থেমে গেছে।"

তারা আরও কিছুক্ষণ হাঁটার পর হঠাৎ করেই সামনে একটা বিশাল পাথরের দেয়াল দেখতে পেল। দেয়ালটা এত বড় যে মনে হচ্ছে আকাশ ছুঁয়েছে। দেয়ালের গায়ে লতাপাতা আর শেওলা জমেছে, যা দেখে মনে হচ্ছে এটা বহু পুরনো। দেয়ালটা এত মসৃণ যে মনে হয় কোনো কারিগর এটি তৈরি করেছে।

"বাহ! কী দারুণ জায়গা!" রাহুল প্রায় চিৎকার করে উঠল। "দেখো মিতা, এই দেয়ালটা নিশ্চয়ই কোনো প্রাচীন সভ্যতার অংশ।"

মিতা দেয়ালটা স্পর্শ করে বলল, "সত্যিই অদ্ভুত। এত বড় পাথরগুলো কিভাবে এখানে এলো? আর দেয়ালটা এত মসৃণ কেন?"

তারা দেয়াল ধরে ধরে হাঁটতে শুরু করল। হঠাৎ করেই রাহুল থমকে দাঁড়াল। "এখানে কিছু একটা আছে," সে বলল।

মিতা তার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করল, "কি আছে?"

রাহুল একটি নির্দিষ্ট দিকে ইশারা করল। সেখানে দেয়ালের গায়ে কিছু অদ্ভুত চিহ্ন আঁকা। চিহ্নগুলো এমন যে কোনো পরিচিত ভাষার সঙ্গে মেলে না। কেমন যেন জ্যামিতিক আকার, কিন্তু তার মধ্যে একটা রহস্যময় বিন্যাস রয়েছে।

"এগুলো কি?" মিতা অবাক হয়ে বলল।

রাহুল চিহ্নগুলোর দিকে তাকিয়ে রইল। তার মনে হলো সে যেন এগুলো আগে কোথাও দেখেছে, কিন্তু মনে করতে পারছে না। "মনে হচ্ছে কোনো প্রাচীন লিপি," সে বলল। "কিন্তু এর মানে কি?"

তারা সেই চিহ্নগুলোর সামনে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ চিন্তা করল। রাহুল তার পকেট থেকে নোটবুক বের করে চিহ্নগুলো আঁকতে শুরু করল। মিতা চারপাশটা আরও ভালো করে দেখতে লাগল। হঠাৎ সে দেয়ালের এক জায়গায় হাত দিয়ে কিছু একটা অনুভব করল।

"রাহুল, এদিকে এসো," মিতা ডাকল। "এখানে কিছু একটা আছে।"

রাহুল দ্রুত মিতার কাছে চলে এল। মিতা দেয়ালের একটি অংশ দেখাচ্ছে, যেখানে লতাপাতাগুলো একটু আলগা। রাহুল হাত দিয়ে সরিয়ে দেখল, সেখানে একটা ফাটল। ফাটলটি এত সরু যে মনে হয় না এর ভেতর দিয়ে কেউ যেতে পারবে।

"এটা কি একটা গুহার প্রবেশদ্বার?" রাহুল উত্তেজিত হয়ে বলল।

মিতা একটু ইতস্তত করে বলল, "মনে তো হচ্ছে। কিন্তু এত সরু পথ দিয়ে বের হওয়া যাবে তো?"

"আরে, এটা নিশ্চয়ই কোনো গুপ্ত গুহা। ভেতরের রহস্যটা কি তা জানতে হবে।" রাহুলের চোখে-মুখে তখন এক অন্যরকম দীপ্তি।

রাহুল সাবধানে ফাটল দিয়ে মাথা ঢুকিয়ে দিল। ভেতরে আবছা অন্ধকার, কিন্তু সে কিছু একটা দেখতে পাচ্ছে। "ভেতরে বেশ বড় জায়গা আছে মনে হচ্ছে," সে বলল। "চলে আসা যাক।"

মিতা একটু দ্বিধা করলেও রাহুলের উত্তেজনায় সেও কিছুটা কৌতূহলী হয়ে উঠল। "ঠিক আছে, কিন্তু সাবধানে। যদি কিছু হয়, তাহলে সঙ্গে সঙ্গে ফিরে আসব।"

রাহুল আগে ঢুকল, তারপর মিতা। গুহার মুখটা খুব সরু হলেও ভেতরে প্রবেশ করতেই তারা দেখল, একটি বিশাল গুহা তাদের সামনে উন্মুক্ত। গুহার ছাদ অনেক উঁচু, আর দেওয়ালগুলো অদ্ভুতভাবে মসৃণ। ভেতরের বাতাসে কেমন যেন একটা ঠান্ডা ভাব।

"ওয়াও! এটা তো অসাধারণ!" রাহুল বিস্ময়ে চারপাশটা দেখতে লাগল। "আমি জীবনে এমন গুহা দেখিনি।"

মিতা টর্চলাইট জ্বালাল। টর্চের আলোয় গুহার দেওয়ালগুলোতে আরও অনেক অদ্ভুত চিহ্ন দেখা গেল। কিছু চিহ্ন দেয়ালের বাইরেও আঁকা। এগুলো দেখে মনে হচ্ছে কোনো প্রাচীন সভ্যতার মানুষেরা এখানে বসতি স্থাপন করেছিল।

"দেখো, এই চিহ্নগুলো বাইরের চিহ্নগুলোর মতোই," মিতা বলল। "মনে হচ্ছে এই গুহাটাই তাদের মূল কেন্দ্র ছিল।"

তারা গুহার আরও গভীরে প্রবেশ করল। গুহার মেঝেতে পাথর ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। কিছু জায়গায় মনে হচ্ছে পাথরগুলো ভেঙে পড়েছে। গুহার এক কোণে তারা একটি বিশাল পাথরের বেদি দেখতে পেল। বেদীর উপর কিছু জিনিসপত্র রাখা।

"এগুলো কি?" রাহুল বেদীর কাছে গিয়ে ঝুঁকে দেখল।

সেখানে কিছু মাটির পাত্র, ভাঙা অস্ত্র এবং কিছু পাথরের টুকরো রাখা। পাত্রগুলো এত পুরনো যে তাদের গায়ে ধুলো জমেছে। অস্ত্রগুলো দেখে মনে হচ্ছে এগুলো কোনো আদিম যুগের অস্ত্র।

"এগুলো নিশ্চয়ই অনেক অনেক পুরনো," মিতা বলল। "মনে হচ্ছে এখানে কোনো প্রাচীন সভ্যতা বাস করত, আর তারা এই গুহাটাকে তাদের উপাসনালয় বা আশ্রয়স্থল হিসেবে ব্যবহার করত।"

রাহুল একটি ভাঙা পাত্র তুলে নিল। পাত্রের গায়েও সেই একই ধরনের অদ্ভুত চিহ্ন আঁকা। "এই চিহ্নগুলোই তাহলে তাদের ভাষা বা প্রতীক?" সে বলল।

তারা গুহার আরও গভীরে যেতে লাগল। গুহার মেঝে ধীরে ধীরে ঢালু হয়ে নিচে নেমে গেছে। টর্চের আলোয় তারা দেখল, গুহার শেষ প্রান্তে একটি বিশাল পাথর চাপা দেওয়া। পাথরটি এত বড় যে মনে হচ্ছে এটি সরানোর কোনো উপায় নেই।

"এখানে কি কিছু লুকিয়ে রাখা আছে?" রাহুল পাথরটির দিকে ইশারা করে বলল।

মিতা পাথরটির চারপাশটা ঘুরে দেখল। "মনে হচ্ছে এর পেছনে কিছু আছে," সে বলল। "কিন্তু এই পাথর সরানো তো আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়।"

রাহুল পাথরটির গায়ে হাত দিয়ে দেখল। "দেখো, এখানে কিছু খাঁজ আছে," সে বলল। "মনে হচ্ছে এই খাঁজগুলো ধরে টানলে পাথরটা সরানো যেতে পারে।"

রাহুল আর মিতা দুজনে মিলে পাথরটি সরানোর চেষ্টা করল। কিন্তু পাথরটি এত ভারী যে তাদের দুজনের পক্ষে সরানো সম্ভব হলো না।

"একা একা পারব না," রাহুল বলল। "আমাদের আরও সাহায্যের প্রয়োজন।"

মিতা বলল, "কিন্তু এখানে তো আমরা ছাড়া আর কেউ নেই।"

রাহুল একটু ভেবে বলল, "হয়তো এই গুহার মধ্যেই এর সমাধানের কোনো উপায় আছে। এই চিহ্নগুলো নিশ্চয়ই কিছু বলছে।"

তারা আবার গুহার দেওয়ালে আঁকা চিহ্নগুলোর দিকে মনোযোগ দিল। রাহুল তার নোটবুকে আঁকা চিহ্নগুলো দেখল। মিতা গুহার দেওয়ালগুলো আবার খুঁটিয়ে দেখতে লাগল। হঠাৎ সে গুহার দেওয়ালে কিছু একটা দেখতে পেল।

"রাহুল, এখানে দেখো!" মিতা উত্তেজিত হয়ে ডাকল।

রাহুল দ্রুত মিতার কাছে ছুটে এল। মিতা একটি নির্দিষ্ট জায়গায় ইশারা করছে। সেখানে গুহার দেওয়ালে কিছু চিহ্ন এমনভাবে আঁকা যে মনে হচ্ছে এগুলো একটি নকশা। নকশাটি দেখে মনে হচ্ছে এটি কোনো ধাঁধা।

"এটা নিশ্চয়ই কোনো সংকেত," রাহুল বলল। "এই সংকেত ব্যবহার করেই হয়তো পাথরটা সরানো যাবে।"

তারা দুজনে মিলে সংকেতটি বোঝার চেষ্টা করতে লাগল। রাহুল তার নোটবুকে আঁকা চিহ্নগুলো আর গুহার দেওয়ালে আঁকা নকশাটি পাশাপাশি রেখে তুলনা করতে লাগল। কিছুক্ষণ পর রাহুলের চোখে-মুখে একটা আলো জ্বলে উঠল।

"পেয়েছি!" রাহুল প্রায় চিৎকার করে উঠল। "এই চিহ্নগুলো আসলে কোনো সংখ্যা বা কোড। আর এই নকশাটা হলো সেই কোড ব্যবহার করার পদ্ধতি।"

রাহুল তার নোটবুক থেকে কিছু চিহ্ন নির্বাচন করল এবং গুহার দেওয়ালে থাকা নকশা অনুযায়ী সেই চিহ্নগুলো স্পর্শ করতে লাগল। প্রতিটি চিহ্ন স্পর্শ করার সাথে সাথে গুহার ভেতর থেকে একটা মৃদু শব্দ আসছে।

"সাবধানে, রাহুল," মিতা বলল।

রাহুল প্রতিটি চিহ্ন সঠিকভাবে স্পর্শ করল। শেষ চিহ্নটি স্পর্শ করার পর গুহার ভেতর থেকে একটি গভীর শব্দ শোনা গেল। তারপর তারা দেখল, যে বিশাল পাথরটি গুহার শেষ প্রান্তে চাপা দেওয়া ছিল, সেটি ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে।

প্রথমে একটুখানি ফাঁক হলো, তারপর ফাঁকটা আরও বড় হতে লাগল। অবশেষে পাথরটি সম্পূর্ণ সরে গেল। পাথরটির পেছনে একটি অন্ধকার পথ খুলে গেল। পথটি এত অন্ধকার যে টর্চের আলোও তার গভীরতা মাপতে পারছে না।

"অবিশ্বাস্য!" রাহুল বলল। "আমরা পেরেছি!"

মিতা বলল, "কিন্তু এই পথটা কোথায় গেছে?"

রাহুল বলল, "যেতেই হোক, আমাদের যেতেই হবে। এটাই হয়তো উপত্যকার মূল রহস্য।"

তারা দুজনে একে অপরের দিকে তাকাল। তাদের চোখে-মুখে একইসাথে ভয় এবং উত্তেজনা। অজানা এক পথে পা বাড়াতে চলেছে তারা, যার শেষ কোথায় কেউ জানে না। এই গুহা, এই চিহ্ন, আর এই গোপন পথ – সবকিছুই যেন এক নতুন অ্যাডভেঞ্চারের হাতছানি দিচ্ছে। রাহুল আগে টর্চ হাতে এগিয়ে গেল, আর মিতা তার পিছু নিল। গুহার অন্ধকার তাদের গ্রাস করল, আর উপত্যকার আরও গভীরে এক অজানা জগতের মুখোমুখি হওয়ার জন্য তারা প্রস্তুত হলো।

✦ ✦ ✦