Chapter 3

প্রাচীন লিপির পাঠোদ্ধার

গুহার ভেতরে রাহুল ও মিতা কিছু অদ্ভুত প্রতীক এবং একটি পুরনো মানচিত্র খুঁজে পায়। এই প্রতীকগুলো কি কোনো গুপ্তধনের সংকেত?

5 min read

গুহার ভেতরের হিমশীতল বাতাস রাহুল আর মিতার গা ঘেঁষে বয়ে যাচ্ছিল। মশালটা কাঁপছিল, আর তার আলোয় গুহার দেয়ালগুলো যেন জীবন্ত হয়ে উঠছিল। দেয়াল জুড়ে আঁকা সেই অদ্ভুত সব চিহ্নগুলো, যা তারা প্রথমে দেখেও দেখেনি, এখন স্পষ্ট হয়ে চোখে পড়ছে। রাহুল নিচু হয়ে একটা চিহ্নের দিকে ইশারা করলো। ‘দেখ মিতা, এই চিহ্নটা… এটা তো অন্যগুলোর চেয়ে আলাদা। কেমন যেন একটা নকশা।’

মিতা ঝুঁকে দেখল। গুহার দেয়ালে নানা ধরনের রেখা, বিন্দুর সমষ্টি, জ্যামিতিক আকারের পাশাপাশি কিছু অদ্ভুত সব ছবিও আঁকা। কিছু চিহ্ন পরিচিত মনে হলেও, বেশিরভাগই অচেনা। ‘সত্যিই তো। এই যে এখানে, একটা গোলকের মধ্যে একটা বিন্দু… আর তার চারপাশে কিছু রেখা। এটা কি কোনো তারার ছবি?’

রাহুল মাথা নাড়ল। ‘ঠিক বলতে পারছি না। তবে মনে হচ্ছে এগুলো কোনো ভাষা। প্রাচীন কোনো লিপির মতো।’ সে তার পকেট থেকে ছোট একটা নোটবুক আর কলম বের করল। সাবধানে গুহার দেয়ালের ছবিগুলো আঁকতে শুরু করল। প্রতিটি চিহ্ন, প্রতিটি রেখা সে মনোযোগ দিয়ে টুকে নিচ্ছে। তার চোখে মুখে এক অদ্ভুত উত্তেজনা। এই অজানা লিপির রহস্য ভেদ করার একটা অদম্য ইচ্ছা তাকে পেয়ে বসেছে।

মিতা দেয়ালের অন্য প্রান্তে ঘুরতে ঘুরতে বলল, ‘রাহুল, এখানে দেখ। এই অংশটা মনে হচ্ছে একটু পরিচ্ছন্ন। মনে হচ্ছে কেউ এটা কিছুদিন আগেও পরিষ্কার করেছে।’ সে একটা নির্দিষ্ট জায়গা দেখিয়ে দিল। সেখানে কিছু চিহ্ন স্পষ্ট, আর তার আশেপাশে ধুলোবালি কম।

রাহুল এগিয়ে গেল। মিতার কথা ঠিক। কিছু চিহ্ন যেন অন্যগুলোর চেয়ে বেশি উজ্জ্বল। আর তার ঠিক পাশেই, পাথরের একটা নিচু জায়গায়, একটা ভাঁজ করা চামড়ার মতো জিনিস পড়ে আছে। জিনিসটা এতই পুরনো যে চামড়াগুলো প্রায় শুকিয়ে খড়খড়ে হয়ে গেছে।

‘এটা কি?’ মিতা ফিসফিস করে বলল।

রাহুল সাবধানে জিনিসটা হাতে নিল। চামড়াটা স্পর্শ করতেই গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে যাওয়ার উপক্রম হল। সে খুব সাবধানে ওটাকে খুলল। ভেতরে কিছু আঁকা। হ্যাঁ, এটা একটা মানচিত্র! পুরনো, বিবর্ণ, কিন্তু স্পষ্ট।

‘মানচিত্র!’ রাহুলের চোখ চকচক করে উঠল। ‘আমি বলেছিলাম না, এই উপত্যকা রহস্যময়! এই গুহা নিশ্চয়ই কোনো গুপ্তধনের পথ দেখাচ্ছে!’

মিতা মানচিত্রটার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘গুপ্তধন? রাহুল, এখনই এত উত্তেজিত হয়ো না। এটা হয়তো অন্য কোনো উপত্যকার মানচিত্র হতে পারে। অথবা এমনিই আঁকা।’

‘না, মিতা, এটা আমাদের উপত্যকারই মানচিত্র। দেখ, এখানে একটা নদী এঁকেছে, আর এই যে পাহাড়ের খাঁজগুলো… এগুলো আমাদের দেখা সেই পাহাড়গুলোর সঙ্গে মিলে যাচ্ছে।’ রাহুল মানচিত্রটার ওপর ঝুঁকে পড়ল। ‘আর এই যে এখানে একটা চিহ্ন… এটা সেই গুহার চিহ্ন, যেখানে আমরা এখন দাঁড়িয়ে আছি। তাহলে এই মানচিত্রটা আমাদের এখান থেকেই অন্য কোথাও নিয়ে যাবে!’

মিতা মানচিত্রটা দেখল। রাহুল ঠিকই বলছে। মানচিত্রের শুরুতে গুহার একটি চিহ্ন, তারপর একটি রেখা এঁকে তা শেষ হয়েছে একটি ঝর্ণার ছবিতে। ঝর্ণার পাশে আবার কিছু চিহ্ন।

‘ঝর্ণা?’ মিতা বলল। ‘এই উপত্যকায় কি কোনো ঝর্ণা আছে?’

রাহুল মাথা নাড়ল। ‘আমার মনে পড়ছে না। আমরা তো উপত্যকার বেশিরভাগ অংশই ঘুরে দেখেছি। তবে এই অংশটা আমরা এখনো যাইনি।’ সে মানচিত্রের শেষ অংশটার দিকে ইশারা করল। ‘এখানে ঝর্ণাটার পাশে কিছু প্রতীক। এই প্রতীকগুলো কি?’

রাহুল আবার গুহার দেয়ালের দিকে তাকাল। সেই অচেনা লিপিগুলো। ‘আমার মনে হয়, এই লিপিগুলো এই মানচিত্রের সঙ্গেই সম্পর্কিত। হয়তো এই লিপিগুলোই আমাদের বলে দেবে ঝর্ণাটার কাছে গিয়ে আমাদের কী করতে হবে।’

মিতা গম্ভীর হয়ে বলল, ‘রাহুল, আমার একটু ভয় ভয় করছে। এই গুহা, এই লিপি, এই মানচিত্র… সবকিছুই খুব রহস্যময়। মনে হচ্ছে আমরা কোনো পুরনো রহস্যের মধ্যে জড়িয়ে পড়ছি।’

‘ভয় পাওয়ার কী আছে?’ রাহুল হেসে উঠল। ‘এটা তো অ্যাডভেঞ্চার! তুমিই তো সবসময় অ্যাডভেঞ্চারের কথা বলো। আর তাছাড়া, আমরা তো দুজন আছি। কোনো সমস্যা হলে আমরা একসাথেই মোকাবিলা করব।’

‘তবুও,’ মিতা বলল, ‘আমাদের খুব সাবধানে থাকতে হবে। এই গুহার ভেতরে আমরা যা পেয়েছি, তা সাধারণ কিছু নয়। মনে হচ্ছে এর পেছনে কোনো গভীর রহস্য লুকিয়ে আছে।’

রাহুল মিতার কাঁধে হাত রাখল। ‘চিন্তা কোরো না। আমি তোমাকে রক্ষা করব। আর এই রহস্যের সমাধান তো আমরা করবই।’

তারা দুজনে আবার দেয়ালের চিহ্নগুলোর দিকে মনোযোগ দিল। রাহুল তার নোটবুকে আঁকা চিহ্নগুলো দেখল, আর মিতা গুহার দেয়ালে থাকা চিহ্নগুলোর সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে লাগল। কিছু চিহ্ন মানচিত্রেও আছে, আবার কিছু চিহ্ন শুধু দেয়ালেই।

‘এই যে,’ মিতা হঠাৎ বলে উঠল। ‘এই চিহ্নটা দেখ, রাহুল। এটা দেখতে অনেকটা সাপের মতো। আর এটা এখানেই, ঠিক এই ঝর্ণার ছবির পাশে। আবার গুহার দেয়ালেও এই চিহ্নটা আছে। মনে হচ্ছে সাপটা এই ঝর্ণার সঙ্গে যুক্ত।’

রাহুল তার নোটবুক পরীক্ষা করল। ‘হ্যাঁ, তুমি ঠিক বলেছ। আর এই যে এখানে, এই জটিল নকশার মতো চিহ্নটা। এটা দেখতে অনেকটা গোলক ধাঁধার মতো। এই চিহ্নটাও মানচিত্রে আছে, আর গুহার দেয়ালেও। মনে হচ্ছে এই গোলক ধাঁধাই আমাদের ঝর্ণা পর্যন্ত যাওয়ার পথ দেখাবে।’

তারা কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে রইল। গুহার নিস্তব্ধতা ভেঙে শুধু তাদের শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ। মশালটা আস্তে আস্তে নিভে আসছিল, আলো কমে আসছিল।

‘আমাদের বেরোতে হবে,’ মিতা বলল। ‘আলো কমে আসছে। আর এই গুহার ভেতরে বেশি থাকা আমার ঠিক মনে হচ্ছে না।’

রাহুল মাথা নাড়ল। ‘ঠিক আছে। কিন্তু আমরা এই মানচিত্র আর লিপির ছবিগুলো নিয়ে যাচ্ছি। বাইরে গিয়ে আমরা এগুলো নিয়ে আরও ভালোভাবে চিন্তা করব।’

তারা সাবধানে মানচিত্রটা ভাঁজ করে রাহুলের ব্যাগে রাখল। গুহার দেয়ালের ছবি আঁকা নোটবুকটাও ব্যাগে ভরে নিল। তারপর তারা গুহার মুখটার দিকে এগিয়ে চলল। বের হওয়ার সময় রাহুল শেষবারের মতো গুহার দেয়ালের দিকে তাকাল। মনে হল, দেয়ালের চিহ্নগুলো যেন তাদের দিকে তাকিয়ে আছে, কিছু বলতে চাইছে।

গুহা থেকে বেরিয়ে আসার পর বাইরের আলোয় তাদের চোখ ধাঁধিয়ে গেল। উপত্যকার বাতাসে তখনো সেই হিমশীতলতা। কিন্তু গুহার ভেতরের রহস্যময়তা তাদের মন থেকে যাচ্ছিল না।

‘তাহলে,’ রাহুল বলল, ‘আমরা মানচিত্র অনুযায়ী ঝর্ণাটা খুঁজতে যাব। কিন্তু কীভাবে?’

‘মানচিত্রটা দেখ,’ মিতা বলল। ‘আমার মনে হয়, আমাদের উপত্যকার উত্তর-পশ্চিম দিকে যেতে হবে। কারণ মানচিত্রে পাহাড়ের খাঁজগুলো সেদিকেই দেখাচ্ছে।’

রাহুল মানচিত্রটা বের করল। ‘হ্যাঁ, তাই তো মনে হচ্ছে। আর এই যে এখানে, এই রেখাটা। এটা কি কোনো সরু পথ?’

‘হতে পারে,’ মিতা বলল। ‘কিন্তু আমাদের খুব সতর্ক থাকতে হবে। উপত্যকার এই দিকটা আমরা এখনো দেখিনি। সেখানে কী আছে, তা আমরা জানি না।’

রাহুল মিতার দিকে তাকিয়ে হাসল। ‘চিন্তা কোরো না। আমরা একসাথে আছি। আর এই রহস্যের সমাধান তো আমরা করবই। এবার আর কোনো বাধা আমাদের আটকাতে পারবে না।’

তাদের চোখে মুখে এক নতুন প্রত্যয়। গুহার ভেতরের রহস্যময় লিপি আর পুরনো মানচিত্র তাদের এক নতুন অভিযানের দিকে ডেকে নিয়ে যাচ্ছিল। অজানা উপত্যকার গভীরে লুকিয়ে থাকা কোনো প্রাচীন রহস্যের হাতছানি তারা অনুভব করতে পারছিল। আগামী দিনগুলো যে আরও রোমাঞ্চকর হতে চলেছে, তা তারা দুজনেই বুঝতে পারছিল।

✦ ✦ ✦
প্রাচীন লিপির পাঠোদ্ধার - অজানা উপত্যকার অভিযান | AI Book Craft