Chapter 2
ডায়েরির গোপন কথা
ডায়েরিতে লেখা এক হারানো প্রেমের করুণ গল্প রাতুলকে আকর্ষণ করে। এই গল্প গ্রামের এক পুরনো রহস্যের সাথে জড়িয়ে আছে। রাতুল এই রহস্যের গভীরে যেতে চায়।
সেই ধুলোমাখা, পুরনো সিন্দুকটা খুলতেই রাতুলের দম বন্ধ হয়ে আসার জোগাড়। কতদিন ধরে ওটা বন্ধ ছিল কে জানে! কিন্তু আজ, দাদুর পুরনো ঘরে আলমারি গোছাতে গিয়ে, হঠাৎ করেই সিন্দুকটার ওপর চোখ পড়ল ওর। ভারি ভারী, লোহার তৈরি, আর তার ওপরে কারুকার্য করা নকশাগুলো যেন কোনও এক অচেনা সময়ের গল্প বলছে। অনেক কষ্টে, কায়দা করে, অনেক পুরনো মরচে ধরা তালাটা খুলল রাতুল। ভেতরে থরে থরে সাজানো পুরনো কাগজপত্র, কিছু হলদে হয়ে যাওয়া ছবি, আর তার ঠিক মাঝখানে, একটা চামড়ায় বাঁধানো ডায়েরি।
ডায়েরিটা হাতে নিতেই কেমন যেন একটা অনুভূতি হলো রাতুলের। নরম, কিন্তু শক্ত। পাতাগুলো এত পাতলা যে মনে হচ্ছে আলতো চাপেই ছিঁড়ে যাবে। প্রথম পাতাটায় বড় বড় করে লেখা—‘আমার প্রেমপত্র’। রাতুলের বুকটা ধুকপুক করে উঠল। দাদু! তার দাদু একসময় এমন প্রেমপত্র লিখতেন?
খুব সাবধানে পাতা ওল্টাতে লাগল রাতুল। প্রথম কয়েকটি পাতায় ছিল শুধু অগোছালো কিছু লেখা, কিছু কবিতার লাইন, আর কিছু আঁকিবুকি। কিন্তু তারপরই একটা নতুন অধ্যায় শুরু হলো। সেখানে, জমাটি অক্ষরে লেখা এক ভালোবাসার গল্প। এক অচেনা নারীর প্রতি গভীর অনুরাগ, যা দাদুর জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছিল। রাতুল পড়তে লাগল, আর সঙ্গে সঙ্গে যেন সে হারিয়ে গেল অন্য এক জগতে।
গল্পটা শুরু হয়েছিল অনেক বছর আগে, এই গ্রামেই। দাদু তখন যুবক। তাঁর লেখায় স্পষ্ট ফুটে উঠেছে এক অপরূপা নারীর কথা। তাঁর হাসি, তাঁর চোখের চাহনি, তাঁর কথা বলার ভঙ্গি—সবই যেন দাদুর মনে গভীর রেখাপাত করেছিল। রাতের পর রাত জেগে তিনি সেই নারীর কথা ভাবতেন, তাঁর জন্য কবিতা লিখতেন। ডায়েরির পাতায় পাতায় ছড়িয়ে ছিল সেই অকথিত ভালোবাসার গভীরতা।
“আমার নিলাঞ্জনা,” দাদু লিখেছেন, “তোমার মুখখানি দেখলে আমার সব দুঃখ দূর হয়ে যায়। তোমার হাসিতে যেন হাজারো সূর্য ওঠে। কবে পাব তোমার দেখা? কবে তোমার হাত ধরে এই পথ ধরে হেঁটে যাব?”
নিলাঞ্জনা। নামটা রাতুলের মনে এক অদ্ভুত রেশ তৈরি করল। গ্রামের কেউ কি এই নামে পরিচিত? তার দাদু কি তবে এই নিলাঞ্জনার প্রেমে পড়েছিলেন? কিন্তু গল্পটা এখানেই শেষ নয়। দাদু লিখেছেন, তাদের এই সুন্দর প্রেম এক গভীর ষড়যন্ত্রের শিকার হয়। কিছু মানুষ নাকি তাদের মিলতে দেয়নি। কিছু ভুল বোঝাবুঝি, কিছু মিথ্যা গুজব তাদের আলাদা করে দিয়েছিল।
“আমার নিলাঞ্জনা আজ কোথায়?” এক জায়গায় লেখা, “আমি জানি না। সে কি আমায় ভুলে গেছে? নাকি এই নিষ্ঠুর পৃথিবী তাকে আমার কাছ থেকে কেড়ে নিয়েছে? আমি খুঁজেছি, কিন্তু কোনও সন্ধান পাইনি। প্রতি রাতে তার মুখখানি স্বপ্নে দেখি, আর সকালে উঠে দেখি সবটাই মিথ্যে।”
এই পর্যন্ত পড়ে রাতুলের মনটা কেমন ভারাক্রান্ত হয়ে উঠল। দাদু এত ভালোবাসতেন নিলাঞ্জনকে, অথচ তাদের মিলন হলো না! কিন্তু তার চেয়েও বেশি কৌতূহল জাগল অন্য জায়গায়। দাদু লিখেছেন, এই ঘটনার সাথে নাকি গ্রামের একটি অমূল্য রত্নও জড়িত। সেই রত্নটি কোথায় গেল, তা কেউ জানে না। আর সেই রত্নের চুরির ঘটনাতেই নাকি নিলাঞ্জনার জীবনে নেমে এসেছিল ঘোর অন্ধকার।
“সেই রত্ন,” দাদু লিখেছেন, “ছিল আমার আর নিলাঞ্জনার ভালোবাসার প্রতীক। কিন্তু এক অশুভ শক্তি তা চুরি করে নিয়ে যায়। আর সেই চুরির অপবাদ দেওয়া হয় নিলাঞ্জনার ওপর। আমি বিশ্বাস করিনি। আমি জানি, নিলাঞ্জনা এমন কাজ করতে পারে না। কিন্তু কে বা কারা এই চক্রান্ত করেছিল, তা আমি আজও খুঁজে পাইনি। সেই অমূল্য রত্ন আজ কোথায়, কে জানে?”
রত্ন? নিলাঞ্জনা? চক্রান্ত? রাতুলের ছোট মগজে সবটা ঠিকঠাক বসছিল না। তার দাদু, এত শান্ত, এত ভদ্র একজন মানুষ, তার জীবনেও এত রহস্য ছিল? এই হারানো প্রেম, এই চুরি যাওয়া রত্ন—এসব কী? গ্রামের শান্ত, ভদ্র মানুষগুলোর আড়ালে কি লুকিয়ে আছে এমন কোনও অন্ধকার দিক?
ডায়েরির পাতায় পাতায় দাদুর লেখাগুলো যেন রাতুলকে এক অচেনা পথের দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছিল। প্রতিটা শব্দ, প্রতিটা বাক্য এক নতুন প্রশ্ন তৈরি করছিল। নিলাঞ্জনা কে ছিলেন? তিনি কি এই গ্রামেই থাকতেন? আর সেই রত্ন? সত্যি কি সেই রত্নের জন্যই নিলাঞ্জনা অপবাদিত হয়েছিলেন?
রাতুলের মনে হলো, এই ডায়েরি শুধু দাদুর স্মৃতিচারণ নয়, এ যেন এক অমীমাংসিত রহস্যের চাবিকাঠি। তার অনুসন্ধিৎসু মন তাকে আর স্থির থাকতে দিচ্ছিল না। সে ঠিক করল, এই রহস্যের গভীরে তাকে যেতেই হবে। দাদুর হারানো প্রেম, নিলাঞ্জনার কী হয়েছিল, আর সেই চুরি যাওয়া রত্ন—সবকিছুর সত্য তাকে খুঁজে বের করতেই হবে।
সেদিন রাতে রাতুলের ঘুম এল না। ডায়েরিটা পাশে নিয়ে শুয়ে রইল সে। দাদুর লেখাগুলো বারবার মনে পড়তে লাগল। নিলাঞ্জনার মুখটা সে কল্পনা করার চেষ্টা করল, কিন্তু কোনও ছবি খুঁজে পেল না। শুধু দাদুর লেখাগুলোতেই নিলাঞ্জনার এক মায়াবী প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠল—এক প্রেমময়ী, কিন্তু দুঃখী নারী।
পরদিন সকালে, রাতুল ঠিক করল, সে গ্রামের পুরনো বাড়িগুলোয় যাবে। যেখানে দাদু নিলাঞ্জনার দেখা পেতেন, যেখানে তাদের প্রেম গোপনে বেড়ে উঠেছিল। সে কথা বলবে গ্রামের পুরনো মানুষদের সাথে। তাদের কাছে জানতে চাইবে সেই সময়ের গল্প। হয়তো তাদের স্মৃতিতেই লুকিয়ে আছে এই রহস্যের কোনও সূত্র।
ডায়েরিটা যত্ন করে ব্যাগে ভরে নিল রাতুল। তার ছোট্ট কৌতূহলী মন এখন এক বিরাট রহস্যের সন্ধানে। সে জানে না এই পথে কী অপেক্ষা করছে, কিন্তু সে প্রস্তুত। গ্রামের শান্ত, ভদ্র পরিবেশের আড়ালে যে এক হারিয়ে যাওয়া প্রেমের গল্প আর এক অমূল্য রত্নের রহস্য লুকিয়ে আছে, তা সে অনুভব করতে পারছিল। আর সেই রহস্যের কিনারা করতে সে বদ্ধপরিকর। তার এই অভিযান তাকে কোথায় নিয়ে যাবে, তা সে নিজেও জানে না। কিন্তু এই অজানা যাত্রাই তাকে টানছিল। ডায়েরির পাতায় লেখা প্রতিটি শব্দ যেন তার কানে ফিসফিস করে বলছিল—‘খুঁজে বের করো, রাতুল। খুঁজে বের করো সেই সত্য, যা বহু বছর ধরে অন্ধকারে ঢাকা পড়ে আছে।’