Chapter 1

শান্ত গ্রামের নিস্তব্ধতা

এক শান্ত, ভদ্র মানুষে ভরা ছোট্ট গ্রাম। এখানে রাতুল নামে এক কৌতূহলী ছেলে তার দাদুর পুরনো এক ডায়েরি খুঁজে পায়। ডায়েরিটি নতুন রহস্যের দরজা খুলে দেয়।

4 min read

শান্ত গ্রামের নিস্তব্ধতা

চারিদিকে সবুজের সমারোহ। গ্রামের নাম শান্তিপুর। নামেই শান্ত, কাজেও শান্ত। এখানকার মানুষেরা যেন এই নামেরই প্রতিচ্ছবি। সকালের নরম রোদ যখন গ্রামের ধুলোমাখা পথগুলোকে সোনালী রঙে রাঙিয়ে তোলে, তখন থেকে শুরু হয় এক নিস্তরঙ্গ জীবন। নেই কোনো কোলাহল, নেই কোনো ব্যস্ততা। সবাই যেন এক অদৃশ্য নিয়মে বাঁধা, এক শান্ত, ভদ্র জীবন যাপন করে। এই গ্রামেরই এক সাধারণ ছেলে রাতুল। বয়স তার বারো কি তেরো। অন্য সব ছেলেদের মতো সেও সারাদিন মাঠে খেলে বেড়ায়, নদীর ধারে বসে মাছ ধরে, তবে রাতুলের মনটা একটু বেশিই কৌতূহলী। চারপাশের সাধারণের মাঝেও সে কিছু অস্বাভাবিকতা খুঁজে বেড়ায়।

একদিন দুপুরবেলা, যখন গ্রামের সবাই দুপুরের খাবারের পর একটু জিরিয়ে নিচ্ছে, রাতুল তখন তার দাদুর পুরনো ঘরটা পরিষ্কার করছিল। দাদু গত হয়েছেন বছর দুয়েক হলো। তার জিনিসপত্রগুলো এখনও সব গুছিয়ে রাখা হয়নি। পুরনো আলমারি, কাঠের সিন্দুক, ধুলোমাখা বইপত্র – সব মিলিয়ে এক অন্যরকম গন্ধ। রাতুল আলমারির এক কোণে রাখা একটা পুরনো সিন্দুক খুলল। ভেতরে কিছু পুরনো কাপড়, কিছু চিঠিপত্র আর একটা চামড়া দিয়ে বাঁধানো ডায়েরি। ডায়েরিটার পাতাগুলো হলদেটে হয়ে গেছে, কিছু জায়গায় ছিঁড়েও গেছে। কিন্তু মলাটটা বেশ মজবুত। রাতুল কৌতূহলী চোখে ডায়েরিটা হাতে নিল। দাদুর হাতের লেখা? হ্যাঁ, তাই তো।

ডায়েরির প্রথম পাতাটা খুলতেই রাতুলের চোখে পড়ল সুন্দর করে লেখা একটি তারিখ: ‘১৫ই জ্যৈষ্ঠ, ১৩৫২ বঙ্গাব্দ’। তারপর শুরু হয়েছে দাদুর লেখা। রাতুল আস্তে আস্তে পড়তে শুরু করল। দাদুর লেখায় এক অন্যরকম আবেগ ছিল, যা পড়তে পড়তে রাতুলেরও মন ছুঁয়ে গেল।

"আজ আবার চাঁদের আলোয় একা বসে আছি। নদীর ধারে সেই পুরোনো বটগাছটার নিচে। চাঁদের আলোয় সবকিছু কেমন মায়াবী লাগে। আর এই মায়াবী রাতে আমার মন জুড়ে শুধু একটি মুখ। যার হাসিতে ছিল ভোরের আলো, যার চোখে ছিল তারাদের মেলা। কিন্তু নিয়তি আমাদের পথ আলাদা করে দিল। আজ এত বছর পরও সেই মুখখানি আমার স্মৃতির গভীরে অমলিন। কোথায় সে আজ? কেমন আছে? শুধু এইটুকু জানার আকাঙ্ক্ষা নিয়েই বেঁচে আছি।"

রাতুল অবাক হয়ে গেল। এ কার কথা লিখছেন দাদু? তার দাদু তো এমন প্রেম-ভালোবাসার কথা কাউকে বলেননি। গ্রামের সবাই দাদুকে জানত একজন শান্ত, সৌম্য মানুষ হিসেবে। তিনি কি কখনো এমন কোনো ভালোবাসার সম্পর্কে জড়িয়েছিলেন? রাতুলের মন কৌতূহলে ভরে উঠল। সে আরও পাতা ওল্টাতে লাগল।

ডায়েরির পরের পাতাগুলোতে আরও কিছু লেখা। কিছু জায়গায় নির্দিষ্ট কিছু জায়গার নাম, কিছু সাংকেতিক চিহ্ন, আর কিছু অস্পষ্ট বর্ণনা। মনে হচ্ছে দাদু কোনো ঘটনার কথা লিখছেন, যা তার জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। কিন্তু ঠিক কী সেই ঘটনা, তা স্পষ্ট নয়। রাতুল বুঝতে পারল, এই ডায়েরিটা শুধু সাধারণ কোনো ডায়েরি নয়, এর মধ্যে লুকিয়ে আছে কোনো রহস্য।

"সেই রাতের কথা মনে পড়লে এখনও আমার বুক কেঁপে ওঠে। নদীর ধারে সেই নির্জনতা, চাঁদের আলো আর… আর সেই রত্ন। হারিয়ে গেল সব। শুধু রয়ে গেল একরাশ হাহাকার আর এক অপূর্ণ ভালোবাসা। কী যে হয়েছিল সেদিন, তা শুধু আমিই জানি। আর জানে… সে।"

রত্ন? কোন রত্ন? আর কার কথা বলছেন দাদু? রাতুলের মনে হাজারো প্রশ্ন ভিড় করতে লাগল। সে ডায়েরিটা নিয়ে নিজের ঘরে এল। বিছানায় বসে আবার প্রথম থেকে পড়তে শুরু করল। এবার আরও মন দিয়ে। প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি বাক্য যেন নতুন কোনো অর্থ বহন করছে।

পরের দিন সকালে, রাতুল আর চুপ করে থাকতে পারল না। সে ডায়েরিটা নিয়ে গ্রামের সবচেয়ে বয়স্ক মানুষ, জ্ঞানদাদু, তার কাছে গেল। জ্ঞানদাদু গ্রামের সব খবর রাখেন, পুরনো দিনের সব গল্প তার নখদর্পণে।

“জ্ঞানদাদু, এই ডায়েরিটা আমার দাদুর। আপনি কি কিছু চিনতে পারছেন?” রাতুল ডায়েরিটা জ্ঞানদাদুর হাতে দিল।

জ্ঞানদাদু চশমার ফাঁক দিয়ে ডায়েরিটা দেখলেন। তারপর পাতা ওল্টাতে লাগলেন। তার মুখেও এক অদ্ভুত ভাব।

“এ তো তোমার দাদুর ডায়েরি। এ তো অনেক পুরনো। কী আছে এর মধ্যে?” জ্ঞানদাদু জিজ্ঞেস করলেন।

রাতুল তখন দাদুর লেখা কিছু অংশ জ্ঞানদাদুকে পড়ে শোনাল। বিশেষ করে প্রেমিকার কথা এবং সেই হারানো রত্নের কথা। জ্ঞানদাদুর মুখটা কেমন গম্ভীর হয়ে গেল।

“তোমার দাদু… হ্যাঁ, তোমার দাদু এক সময় খুব ভালোবাসতেন একজন মেয়েকে। কিন্তু… সে এক অন্য গল্প। অনেক পুরনো কথা। গ্রামের মানুষ এখন সব ভুলে গেছে।” জ্ঞানদাদু দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

“কী গল্প দাদু? প্লিজ বলুন!” রাতুলের চোখেমুখে আকুতি।

জ্ঞানদাদু কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন, “সে অনেক কথা, রাতুল। অনেক পুরনো বিবাদ, এক হারানো প্রেম আর এক অমূল্য রত্ন। সবটা এক সুতোয় বাঁধা। তোমার দাদু সেই ঘটনার সাক্ষী ছিলেন, হয়তো বা…? যাকগে, এসব কথা বলে আর কী হবে?”

রাতুল বুঝতে পারল, জ্ঞানদাদু সবটা জানেন, কিন্তু বলতে চাইছেন না। সে ডায়েরিটা নিয়ে বাড়ি ফিরে এল। তার মনে হলো, এই ডায়েরিটা শুধু দাদুর স্মৃতির কথা নয়, এটা একটা রহস্যের চাবিকাঠি। আর সেই রহস্যের সমাধান তাকেই করতে হবে। সে দাদুর ডায়েরিটাকে আঁকড়ে ধরল। তার কৌতূহলী মন তখন থেকেই সেই হারানো প্রেমের রহস্যের গভীরে ডুব দিতে শুরু করেছে। শান্ত গ্রামের নিস্তব্ধতার আড়ালে যে কত বড় এক রহস্য লুকিয়ে আছে, তা সে তখনও জানত না। শুধু জানত, এই ডায়েরিটা তাকে এক নতুন পথের দিকে নিয়ে যাবে। একটি অজানা, রোমাঞ্চকর পথের দিকে।

✦ ✦ ✦