Chapter 3

অতীতের সন্ধানে

রাতুল ডায়েরির সূত্র ধরে গ্রামের পুরনো বাড়ি, লুকানো বাগান ও বৃদ্ধদের সাথে কথা বলে। সে হারানো প্রেমের সূত্র খুঁজতে শুরু করে।

6 min read

গ্রামের নিস্তব্ধতা আর শান্ত পরিবেশ রাতুলের মনকে এক অদ্ভুত প্রশান্তি দিত, কিন্তু দাদুর সেই পুরনো ডায়েরিটা হাতে আসার পর থেকে সেই প্রশান্তি এক নতুন রূপে ধরা দিল। ডায়েরির প্রত্যেকটি পাতা যেন এক একটি রহস্যের দরজা খুলে দিচ্ছিল, আর রাতুল সেই দরজার ওপারে কী আছে তা জানার জন্য অধীর হয়ে অপেক্ষা করছিল। সে জানত, এই ডায়েরির ভেতরে লুকিয়ে আছে তার দাদুর হারানো প্রেমের গল্প, আর সেই গল্পের সূত্র ধরেই সে গ্রামের এক গভীর রহস্যের গভীরে প্রবেশ করতে চলেছে।

পরদিন সকাল হতেই রাতুলের মনে নতুন উদ্যম। সে ডায়েরিটা সাথে নিয়ে বেরিয়ে পড়ল। গ্রামের প্রতিটি কোণা, প্রতিটি পথ তার কাছে নতুন মনে হতে লাগল। সে প্রথমে গেল গ্রামের সবচেয়ে পুরনো বাড়িটার দিকে। বাড়িটা অনেকদিন ধরেই খালি পড়ে আছে, দেওয়ালে শ্যাওলা জমেছে, জানলার কাঁচগুলো ধুলো আর মাকড়সার জালে ঢাকা। লোকে বলে, এই বাড়িতে একসময় এক ধনী পরিবার থাকত, কিন্তু এখন তারা আর নেই। রাতুল সাবধানে বাড়ির ভাঙা গেট খুলে ভেতরে ঢুকল। ভেতরে ঘাস আর আগাছায় ভর্তি, এককালে যা ছিল সুন্দর বাগান, এখন তা এক বুনো জঙ্গলের রূপ নিয়েছে। ডায়েরিতে লেখা ছিল, "সেই বাগানের গভীরে, যেখানে চাঁদের আলো এসে পড়ে, সেখানেই লুকিয়ে আছে আমাদের গোপন কথা।" রাতুল চারপাশ খুঁজতে লাগল, কিন্তু চাঁদের আলো আর কোথায় পড়বে, সে তো দিনের বেলা! তবুও সে মন দিয়ে খুঁজতে লাগল, পুরনো বড় গাছগুলোর নিচে, ঝোপঝাড়ের আড়ালে। হঠাৎ তার চোখে পড়ল একটা পুরনো পাথরের বেদি, তার উপর লতাপাতা জড়িয়ে আছে। সাবধানে সেগুলো সরাতেই সে দেখতে পেল বেদির নিচে একটি ছোট পাথর, যা অন্য পাথরের চেয়ে একটু আলগা। অনেক কষ্টে পাথরটা সরাতেই সে দেখতে পেল একটা ছোট কুঠুরি, আর তার ভেতরে একটা জং ধরা টিনের বাক্স। বুক ধড়ফড় করতে লাগল রাতুলের। এটা কি তবে সেই গুপ্তধন, যার কথা ডায়েরিতে লেখা ছিল? নাকি এর ভেতরে লুকিয়ে আছে আরও বড় কোনো রহস্য?

বাক্সটা খুলে রাতুল দেখল, ভেতরে কিছু পুরনো চিঠি আর একটা ছোট কাপড়ের পুতুল। চিঠিগুলো হলদে হয়ে গেছে, লেখার কালিও প্রায় মুছে গেছে। কিন্তু কোনোমতে পড়া যাচ্ছে। চিঠিগুলোতে লেখা আছে এক গভীর ভালোবাসার কথা, কিন্তু সেই সাথে রয়েছে এক অজানা ভয় আর বিচ্ছেদের সুর। সে বুঝতে পারল, এই চিঠিগুলোই তার দাদুর হারানো প্রেমের কাহিনি। কিন্তু কে ছিল সেই প্রেমিকা? আর কেনই বা তাদের প্রেম হারিয়ে গেল?

চিঠিগুলো পড়তে পড়তে রাতুল গ্রামের দিকে ফিরে এল। পথে তার দেখা হল গ্রামের সবচেয়ে বয়স্ক মহিলা, দিদিমার সাথে। দিদিমা গ্রামের সব খবর রাখেন, আর পুরনো দিনের অনেক গল্পও বলেন। রাতুল দিদিমার কাছে গিয়ে বসল।

"দিদিমা, তুমি কি পুরনো দিনের কথা কিছু বলতে পারো?" রাতুল জিজ্ঞেস করল। দিদিমা হেসে বললেন, "কীসের কথা জানতে চাও, বাবা?" "আমার দাদুর কথা," রাতুল বলল। "আমার দাদুর একটা ডায়েরি পেয়েছি, সেখানে এক হারানো প্রেমের কথা লেখা আছে।"

দিদিমা কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন, যেন কিছু ভাবছেন। তারপর বললেন, "তোমার দাদু তো খুব ভালো লোক ছিলেন। তার প্রেমও ছিল গভীর। কিন্তু গ্রামের কিছু গোলমালের জন্য তাদের আলাদা হয়ে যেতে হয়েছিল।" "গোলমাল? কী গোলমাল?" রাতুল উৎসুক হয়ে জিজ্ঞেস করল। দিদিমা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, "সে এক পুরনো কথা, বাবা। তখন গ্রামে একজন খুব ধনী লোক থাকতেন। তার একটা খুব দামি হিরে ছিল। সেই হিরেটা একদিন চুরি হয়ে যায়। আর সেই চুরির দায়ে তোমার দাদুর প্রেমিকার বাবাকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। কিন্তু আসলে কে চুরি করেছিল, তা কেউ জানে না। সেই ঘটনার পর থেকেই গ্রামের পরিবেশ বদলে যায়।"

রাতুল অবাক হয়ে শুনছিল। তার দাদুর ডায়েরিতে লেখা ছিল এক হারানো প্রেমের গল্প, আর এখন সে জানতে পারছে গ্রামের এক পুরনো বিবাদের কথা, এক চুরি যাওয়া হিরের কথা। সব যেন একসূত্রে বাঁধা। সে দিদিমাকে আরও অনেক প্রশ্ন করল, কিন্তু দিদিমা ততটুকু জানানোর পরেই চুপ করে গেলেন। তিনি বললেন, "এই সব পুরনো কথা তুলে আর কী হবে, বাবা। শান্তিটাই আসল।"

কিন্তু রাতুলের মনে শান্তি নেই। সে বুঝতে পারছিল, এই হারানো প্রেম আর চুরি যাওয়া হিরের মধ্যে কোনো একটা যোগসূত্র আছে। সে আবার ডায়েরিটা নিয়ে বসল। গভীর রাত পর্যন্ত সে ডায়েরির প্রতিটি অক্ষর, প্রতিটি শব্দ খুঁটিয়ে দেখতে লাগল। ডায়েরির একটা পাতায় দাদু লিখেছিলেন, "যখন পূর্ণিমা আসবে, আর নদী শান্ত থাকবে, তখন আমি এক নতুন পথের সন্ধান পাব।" রাতুল বুঝতে পারল, পূর্ণিমার রাত তার জন্য নতুন কোনো সূত্র নিয়ে আসবে।

পরদিন সে গ্রামের অন্য পুরনো বাড়িগুলোতে ঘুরতে শুরু করল। প্রত্যেক বাড়িতেই সে চেষ্টা করল পুরনো দিনের কোনো ঘটনার কথা জানতে। কিছু লোক তাকে পুরনো দিনের গল্প শোনাল, কিন্তু কেউ সেই হিরের চুরির ঘটনার কথা স্পষ্ট করে বলল না। অনেকেই যেন ভয়ে বা অন্য কোনো কারণে চুপ করে রইল। রাতুল বুঝতে পারছিল, গ্রামের মানুষ কিছু একটা লুকাতে চাইছে।

একদিন সে গ্রামের শেষ প্রান্তে, নদীর ধারে এক পুরনো মন্দিরের কাছে গেল। মন্দিরটা অনেকদিন ধরে বন্ধ। মন্দিরের সামনে একটা বড় বটগাছ, তার নিচে এক বৃদ্ধ বসে আছেন। তিনি গ্রামেরই একজন, কিন্তু প্রায় কারো সাথেই কথা বলেন না। রাতুল তার পাশে গিয়ে বসল।

"ঠাকুর, আপনি কি কিছু জানেন?" রাতুল জিজ্ঞেস করল। বৃদ্ধ রাতুলের দিকে তাকালেন। তার চোখে এক অদ্ভুত গভীরতা। তিনি বললেন, "জানতে চাও? তবে সব সত্য সব সময় সুখের হয় না।" "আমি সত্য জানতে চাই," রাতুল দৃঢ় কণ্ঠে বলল। বৃদ্ধ বললেন, "সেই হিরেটা আসলে চুরি হয়নি। সেটা আসলে নিজের থেকেই হারিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু গ্রামের কিছু লোভী মানুষ সেই সুযোগ নিয়েছিল। তারা তোমার দাদুর প্রেমিকার বাবাকে ফাঁসিয়ে দিয়েছিল, যাতে তারা নিজেরা সেই হিরেটা হাতিয়ে নিতে পারে।"

রাতুল শুনছিল। তার মনে হচ্ছিল, সে যেন এক গোলকধাঁধায় আটকে গেছে। দাদুর ডায়েরি, হারানো প্রেম, চুরি যাওয়া হিরে, গ্রামের বিবাদ – সব কিছু যেন একাকার হয়ে যাচ্ছে। সে বুঝতে পারছিল, এই রহস্যের জট খুলতে হলে তাকে আরও গভীরে যেতে হবে। কিন্তু কীভাবে?

বৃদ্ধ আরও বললেন, "সেই হিরেটা আসলে এক অভিশপ্ত হিরে। যে এটা ব্যবহার করতে চায়, তার জীবনে অমঙ্গল নেমে আসে। তোমার দাদুর প্রেমিকার বাবা এটা লুকিয়ে রেখেছিলেন, যাতে গ্রামে আর কোনো অশান্তি না হয়। কিন্তু গ্রামের কিছু লোক সেটা খুঁজে বের করতে চেয়েছিল।"

রাতুল ভাবছিল। তার দাদুর ডায়েরির মধ্যে কি সেই হিরের কোনো উল্লেখ আছে? সে আবার ডায়েরিটা নিয়ে বসল। অনেক খোঁজার পর, ডায়েরির একদম শেষের দিকে, যেখানে কালি প্রায় মুছে গেছে, সেখানে সে কিছু অস্পষ্ট অক্ষর দেখতে পেল। অনেক চেষ্টা করে সে সেগুলো উদ্ধার করল। সেখানে লেখা ছিল, "আমার ভালোবাসা, আমি সব কিছু দিয়ে চেষ্টা করব তোমাকে ফিরে পেতে। সেই হিরে নয়, আমাদের ভালোবাসাটাই আসল।"

রাতুল বুঝতে পারল, তার দাদু সেই প্রেমিকার বাবাকে সাহায্য করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু কেন তিনি সফল হননি? আর সেই প্রেমিকা কোথায় গেল? রাতুল অনুভব করল, এই হারানো প্রেমের রহস্যের সাথে গ্রামের শান্তি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। আর এই রহস্যের সমাধান তাকেই করতে হবে। রাতের আকাশে তখন সবেমাত্র চাঁদ উঠতে শুরু করেছে, আর রাতুলের মনে নতুন এক প্রত্যয় জন্ম নিল। সে ঠিক করল, যেভাবেই হোক, তাকে এই হারানো প্রেমের সত্য উদঘাটন করতে হবে।

✦ ✦ ✦
অতীতের সন্ধানে - হারানো প্রেমের রহস্য | AI Book Craft